সালমা আহমেদ হীরা
বাঙালির গৌরব বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত (জন্ম ৯ ডিসেম্বর ১৮৮০) হলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর একজন খ্যাতিমান বাঙালি সাহিত্যিক, সমাজ সংস্কারক ও ফেমিনিস্ট। একজন যুগশ্রেষ্ঠ বাঙালি নারী। তিনি চেয়েছিলেন নারীসমাজকে জাগাতে। এজন্য তাকে বলা হয় নারী জাগরণের অগ্রদূত। শুধু বাঙালি নারী নয়, মুক্তমনা পুরুষের কাছেও তিনি সম্মানিত।
ভাষা আন্দোলনেরও আগে বেগম রোকেয়া বাংলা ভাষার জন্য সংগ্রাম করেছেন। সে যুগে উচ্চবিত্ত মুসলিম পরিবারে বাংলায় কথা বলার প্রচলন ছিল না। অভিজাত শ্রেণির মুসলমানদের ভাষা ছিল উর্দু। রোকেয়া উপলব্ধি করেন, এ দেশের অধিকাংশ মুসলমানের ভাষা বাংলা। মাতৃভাষার প্রতি গভীর মমত্ববোধ থেকে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, বাংলা ভাষা ভালোভাবে আয়ত্ত করে বাংলাকে বক্তব্য প্রকাশের মাধ্যম করবেন। ১৯২৭ সালে বঙ্গীয় নারী শিক্ষা সম্মেলনে বেগম রোকেয়া বাংলা ভাষার পক্ষে বক্তব্য রাখেন। এটি সে যুগে দুঃসাহসের পরিচয় বহন করে।
বেগম রোকেয়া ও তার বোন করিমুন্নেসা খানম বাংলা শেখার আগ্রহ প্রকাশ করলেন, সেই সঙ্গে ইংরেজিও। বড় ভাই মোহাম্মদ ইব্রাহীম আবুল আসাদ সাবের ছিলেন আধুনিকমনস্ক। দুই বোনকে ঘরেই গোপনে বাংলা ও ইংরেজি শেখান তিনি। রোকেয়া ছিলেন জ্ঞানপিপাসু। গভীর রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে তিনি চুপিচুপি বড় ভাইয়ের কাছে বাংলা ও ইংরেজি শিখতেন। বাংলা ও ইংরেজি শেখার ক্ষেত্রে দুই বোনের মধ্যে করিমুন্নেসা দৃঢ় অবস্থান নেওয়ায় তাকে শাস্তিস্বরূপ পড়া বন্ধ করে দিয়ে বলিয়াদিতে মাতামহের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে তাকে বিয়ে দেওয়া হয়। তেইশ বছর বয়সে বিধবা হন তিনি।
১৮৯৮ সালে ১৮ বছর বয়সে রোকেয়ার বিয়ে হয়। ভাগলপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট খানবাহাদুর সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে। তার স্বামী মুক্তমনের মানুষ ছিলেন। রোকেয়ার সৌভাগ্য যে, বাংলা ভাষা শেখা ও লেখালেখিতে উৎসাহ দেন সাখাওয়াত হোসেন। স্বামীর পূর্ণ সমর্থনে তার সাহিত্য চর্চা শুরু হয়। বেগম রোকেয়ার বাংলায় লেখা যেসব সাহিত্যকৃতি আমরা পেয়েছি, তা সম্ভব হয়েছে বাংলা শেখার জন্য, এ কথা অস্বীকারের সুযোগ নেই এবং সাখাওয়াত হোসেনের সমর্থন ছাড়া এটি অসম্ভব ছিল, তাও মনে রাখতে হবে। বাংলা সাহিত্যে বেগম রোকেয়ার অবদান উল্লেখযোগ্য। তাকে ভাষাসংগ্রামী বললেও অত্যুক্তি হয় না।
বেগম রোকেয়া একশত বছর আগে নারী মুক্তির কথা বলেছেন। তখনকার প্রেক্ষাপট বলতে গেলে মুসলমান নারী ও পুরুষ উভয়ই পিছিয়ে ছিল। তখন তিনি নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে কথা বলেছিলেন,‘‘পুরুষের সমকক্ষতা লাভের জন্য আমাদিগকে যাহা করিতে হয়, তাহাই করিব। যদি এখন স্বাধীনভাবে জীবিকা অর্জন করিলে স্বাধীনতা লাভ হয়, তবে তাহাই করিব। আবশ্যক হইলে আমরা লেডী কেরানী হইতে আরম্ভ করিয়া লেডী ম্যাজিষ্ট্রেট, লেডী ব্যারিষ্টার, লেডী জজ সবই হইব। পঞ্চাশ বছর পরে লেডী Viceroy হইয়া এদেশের সমস্ত নারীকে ‘রাণী' করিয়া ফেলিব !! উপার্জন করিব না কেন? আমাদের কি হাত নাই, না পা নাই, না বুদ্ধি নাই? কি নাই? যে পরিশ্রম আমরা ‘স্বামী 'র গৃহকার্য্যে ব্যয় করি, সেই পরিশ্রম দ্বারা কি স্বাধীন ব্যবসায় করিতে পারিব না? ” (স্ত্রী জাতির অবনতি)।
একশ বছর আগে এমন সত্য উচ্চারণ করতে পেরেছিলেন বলেই তিনি ইতিহাসে মহিয়সী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। নারীদের উদ্দেশ্যে তিনি আরও বলেছেন, “তোমাদের কন্যাগুলোকে সুশিক্ষিতা করিয়া কার্য্যক্ষেত্রে ছাড়িয়া দাও, নিজের অন্নবস্ত্র উপার্জন করুক” (স্ত্রী জাতির অবনতি)। এ কথা আজ নারী জাতির উপলব্ধির বিষয়। শুধু নারী কেন বলছি, আধুনিক পুরুষের কাছেও রোকেয়ার বাণী আদৃত হয়েছে। তাকে ও তার লেখাকে তারা ইতিবাচকভাবেই মূল্যায়ন করেছেন।
বেগম রোকেয়ার নারী মুক্তির উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষা ও কর্মসংস্থান। তিনি পথ খুলে দিয়েছেন বলে আজ নারীদের সামনে সব পথ খোলা।
বেগম রোকেয়া ছিলেন দূরদর্শী। আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা,নারীর ভোটাধিকার, সমকালীন রাজনীতি, বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তা, ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি, সমাজের নি¤œ শ্রেণির মানুষের দুর্দশা, বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহের মতো বিষয় নিয়ে তিনি একশ বছর আগেও ছিলেন সোচ্চার। পরিসংখ্যান ও যুক্তি দিয়ে বলেছেনÑ “এখন আমাদের শিক্ষার অবস্থা এই যে, আমাদের দেশের গড়পড়তা প্রতি ২০০ বালিকার মধ্যে একজনও অক্ষর চেনে না; প্রকৃত শিক্ষিতা মহিলা প্রতি ১০,০০০এ একজন পাওয়া যাইবে না। তিন কোটি মুসলমানের মধ্যে বঙ্গের মাত্র একজন মুসলমান মহিলা গ্রাজুয়েট পাওয়া গেছে। স্ত্রী লোকেরা ভোটের অধিকার প্রাপ্ত হইয়াছে, কিন্তু ইলেকশানের সময় কলকাতার মাত্র ৪ জন স্ত্রীলোক ভোট দিয়াছে।”
বেগম রোকেয়া এমন একজন নারী, যিনি নারীদের মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন এবং শিক্ষা ছাড়া যে তা সম্ভব নয়, সে সত্য তিনি ঊনবিংশ শতকেই উপলব্ধি করেছেন। উপলব্ধি করে বসে থাকেননি, নারী শিক্ষা প্রসারে ব্রতী হয়েছেন।
বিয়ের পরই মূলত বেগম রোকেয়া পরিপূর্ণভাবে স্বাধীন হন এবং নিজেকে তুলে ধরার সুযোগ পান। তার ব্যক্তিজীবন পর্যালোচনা করলে এটি স্পষ্ট হয়। স্বামীর উৎসাহ ও সহযোগিতায় দেশি-বিদেশি লেখকদের রচনার সঙ্গে পরিচিত হন রোকেয়া। সাহিত্যচর্চার সূত্রপাতও ঘটে স্বামীর অনুপ্রেরণায়। ১৯০২ সালে, চৈত্র ও বৈশাখ, ১৩০৮-১৩০৯ (যুগ্মসংখ্যা) নবপ্রভা পত্রিকায় ‘পিপাসা ’ (মহরম) নামে একটি বাংলা গল্প লিখে সাহিত্য জগতে পদচারণা শুরু হয় তাঁর।
১৯০৪ সালের ১৫ ডিসেম্বরে প্রকাশিত হয় রোকেয়ার প্রথম গ্রন্থ ‘মতিচুর’ (প্রথম খ-)। তখন তার বয়স মাত্র চব্বিশ। প্রবন্ধটি তার দ্বিতীয় লেখা। সাহিত্যিক হিসেবে তৎকালীন যুগের প্রেক্ষাপটে রোকেয়া ছিলেন বিরল প্রতিভা। নবনূর, সওগাত, মোহাম্মদী, নবপ্রভা, মহিলা, ভারতমহিলা, আল এসলাম, নওরোজ, মাহে নও, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা,The Mussalman, Indian Ladies Magazine প্রভৃতি পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লিখতেন।
তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রচনা Sultana’s Dream (সুলতানার স্বপ্ন)। এটিকে বিশ্বের নারীবাদী সাহিত্যের একটি মাইলফলক ধরা হয়।
নিজের প্রকাশনায় বেগম রোকেয়ার উপন্যাস ‘পদ্মরাগ’ প্রকাশিত হয় ১৯২৪ সালে। ‘ সওগাত’ সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন তাকে উৎসাহিত করেন স্বাধীন মতামত প্রকাশের জন্য। সওগাতে তার সম্পৃক্ততা ছিল নিবিড়। এ পত্রিকার প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যায় (অগ্রহায়ণ ১৩২৫) প্রথম পৃষ্ঠায় রোকেয়ার ‘সওগাত’ কবিতাটি ছাপা হয়। রোকেয়ার উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে আরও রয়েছে অবরোধবাসিনী (নকশাধর্মী গদ্যগ্রন্থ, ১৯৩১),Lady Land (নারীস্থান), সৌরজগৎ, ডেলিসিয়া হত্যা, (মেরী কারলী রচিত Murder of Delicia, ১৮৯৬ উপন্যাসের গল্পাংশের অনুবাদ), জ্ঞান-ফল, নারী-সৃষ্টি, নার্স নেলী, মুক্তিফল প্রভৃতি গল্প ও রূপকথা।
বাঙালি মুসলমান সমাজে নারীর স্বাতন্ত্র্য ও নারী স্বাধীনতার পক্ষে প্রথম প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর বেগম রোকেয়ার সাহিত্য ও সামাজিক কর্মকান্ডের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন সে যুগের বিশিষ্টজনরা। বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা তার রেয়েছে অসংখ্য চিঠি।
বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের ইতিহাসে বেগম রোকেয়ার অবদান চির অম্লান। তিনি শুধু নারী নয়, সমগ্র বাঙালি সমাজকে জাগাতে চেয়েছেন।
নারী আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র বেগম রোকেয়ার জীবনকাল ছিল মাত্র ৫২ বছর। ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর ফজরের আজানের পর কলকাতায় তার মৃত্যু হয়। কায়সার স্ট্রিটের বুআলী কলন্দর মসজিদে জুমার নামাজের পর তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় সে সময়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিÑশেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, স্যার আবদুল করিম গজনভী, নবাব কে জি এম ফারুকী, খাজা নাজিমুদ্দিন, ড. আর আহমদ, মৌলভী মজিবর রহমান, খান বাহাদুর তসদ্দক আহমদ, নবাবজাদা তোফাজ্জল আহমদ, আমিন আহমদ প্রমুখ অংশ নেন।
আত্মীয় মাওলানা আবদুর রহমান খানের পারিবারিক কবরস্থান কলকাতার উপকণ্ঠে সোদপুরের শুখচরে তাকে সমাহিত করা হয়।


